
বিশেষ প্রতিবেদক:-
কক্সবাজার শহরে বছরের পর বছর ধরে চলছিল মাদকের ভয়াবহ বাণিজ্য। শহরের আলোচিত ‘ইয়াবা কুইন’ রোজিনা আক্তারের হয়ে হিসাব রক্ষার দায়িত্বে থাকা বহু অপকর্মের হোতা মোহাম্মদ ফয়সাল শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছেন পুলিশের জালে।
পুলিশের দাবি, ফয়সালকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ হামলা। ইটপাটকেল, কিলঘুষি, নারী পুলিশ সদস্যদের মারধর- সব মিলিয়ে যেন রোজিনার বাড়িটি রূপ নেয় রণক্ষেত্রে।
রোববার (২৯ জুলাই) বিকেলে শহরের কুতুবদিয়া পাড়ায় রোজিনার বাসভবনে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালায় কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ। অভিযান চলাকালে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন রোজিনা আক্তার। তার আহ্বানে মুহূর্তেই জড়ো হয়ে যান ৪০-৫০ জন নারী-পুরুষ। এসময় নেতৃত্ব দেন ফয়সাল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মোহাম্মদ ফয়সাল মূলত এক রকম অশিক্ষিত, সুযোগসন্ধানী অপকর্মবাজ। নিজের পরিচয় গোপন রেখে সাংবাদিকের নামে আইডি কার্ড ঝুলিয়ে চলাফেরা করলেও তার আসল কাজ ছিল ইয়াবার টাকা গোনা। কক্সবাজারের কুখ্যাত ইয়াবা কুইন রোজিনা আক্তারের ক্যাশিয়ার হিসেবে বছরের পর বছর ধরে তিনি মাদক কারবারের অর্থ লেনদেন, চালান ম্যানেজমেন্ট ও নিরাপদ রুট তৈরির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কেউ প্রতিবাদ করলেই সাংবাদিকতার ভুয়া দাপট দেখিয়ে ভয় দেখাতেন। এলাকার লোকজন বলেন- ফয়সাল ছিল রোজিনার ডান হাত নয়, পুরো একটা বিষাক্ত শিকড়।
পুলিশ জানায়, তারা বাঁশ, লাঠি ও ইট নিয়ে পুলিশকে ঘিরে ধরে হামলা চালায়। নারী পুলিশ সদস্য পূর্ণিমা বড়ুয়া ও দোলা চাকমাকে বেধড়ক মারধর করে জখম করা হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কক্সবাজার সদর থানা থেকে অতিরিক্ত ফোর্স পাঠানো হয়। অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে মোহাম্মদ ফয়সালকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও মূল হোতা রোজিনা পালিয়ে যান।
গ্রেপ্তার ফয়সাল কক্সবাজার শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়া পাড়ার বাসিন্দা আজিজুল হকের ছেলে।
স্থানীয়রা বলছেন, ফয়সাল স্কুলের বারান্দায় পা রাখা হয়নি তার। সাংবাদিক পরিচয়ে চলাফেরা করলেও তিনি মূলত রোজিনার মাদক সাম্রাজ্যের ‘ক্যাশিয়ার’। ইয়াবার টাকার হিসাব, লেনদেন এবং নিরাপদ রুটে মালামাল পাঠানোসহ সব আর্থিক কার্যক্রম ফয়সালের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, অশিক্ষিত ফয়সাল অপকর্ম করতে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে চলাফেরা করত। অথচ সবাই জানত সে রোজিনার ডান হাত। প্রকাশ্যে ইয়াবার গন্ধে শহর ডুবে গেলেও তার কোনো ভয় ছিল না।
রোজিনা আক্তার কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘ইয়াবা কুইন’ নামেই পরিচিত।
এলাকাবাসী বলছে, রাজনৈতিক পরিচয় আর সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড লাগিয়ে বহু বছর ধরে তিনি শহরে একরকম ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। স্কুলছাত্রী থেকে শুরু করে গৃহবধূ- যারা প্রতিবাদ করেছে, তারা হয়রানির শিকার হয়েছেন, কেউ কেউ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলছে, রোজিনার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকলেও থানায় তার নাম উঠলে উপর মহলের ফোনে সব ঠাণ্ডা হয়ে যেতো। এখন পুলিশের ওপর হামলার পর যদি তাকে ধরা না হয়, তাহলে এই শহরে আইনের শাসন বলে কিছু থাকবে না।
ঘটনার বিষয়ে কক্সবাজার সদর থানার ওসি ইলিয়াস খান জানান, সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা, পুলিশ সদস্যদের মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে রোজিনা আক্তার, মোহাম্মদ ফয়সালসহ অজ্ঞাত ৪০-৫০ জন নারী-পুরুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। রোজিনাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, আসামিরা আইনানুগ গ্রেপ্তার ঠেকাতে পুলিশের ওপর সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ইট, লাঠি, লোহার রড উদ্ধার করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, রোজিনা ও ফয়সালের কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভে ফুঁসছিলেন স্থানীয়রা। গ্রেপতারের খবরে এলাকাজুড়ে স্বস্তি দেখা দিলেও রোজিনার পালিয়ে যাওয়া নিয়ে ক্ষোভ রয়ে গেছে।
স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক বলেন, রোজিনা শুধু মাদক নয়, এলাকায় ভয় দেখিয়ে জমি দখল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বহু মানুষের সর্বনাশ করেছে। আজকে যদি প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এই শহরে ইয়াবার বিরুদ্ধে লড়াই একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে।
একজন ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ের আড়ালে, রাজনৈতিক পরিচয়ে মাথা উঁচু করে বছরের পর বছর ধরে মাদকের রাজত্ব চালিয়ে যাওয়ার পরেও যদি আইনের ফাঁক গলে রোজিনা বারবার পালিয়ে যেতে পারেন- তবে কক্সবাজার শহরের ভবিষ্যৎ খুব একটা শুভ হবে না। এমনটাই বলছেন সচেতন মহল।