
মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে ক্যাবল চুরি বন্ধ হচ্ছে না, অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পস্কোর হাসান–সুমন সিন্ডিকেট
হাফিজুর রহমান খান, স্টাফ রিপোর্টার (কক্সবাজার)::
মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে ক্যাবল চুরি যেন দীর্ঘদিনের ‘খোলা গোপন’। গত বছর অক্টোবর মাসে পাচারের সময় প্রায় ১৫ কোটি টাকার তামার ক্যাবল নৌবাহিনীর একটি টিম বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪নং জেটিঘাট হতে বার্জে উত্তোলনকালে জব্দ করার পরেও প্রকল্পের ভেতরের অনিয়ম চুরি থামছে না। ঐ ১৫ কোটি টাকার ক্যাবল পাচারে পস্কো কোম্পানির কিউসি ম্যানেজার নাহিদ হাসানও জড়িত ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
সাম্প্রতিক কিউসি ম্যানেজার নাহিদ হাসান এবং সিকিউরিটি অফিসার নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা সুমন বাপ্পির নেতৃত্বে একটি কমিশন ভিত্তিক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠেছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই সিন্ডিকেটই প্রকল্পের দুর্নীতি ও মালামাল পাচারের মূল চালিকাশক্তি। দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার পেছনে একা কেউ নেই। অনুমতি, পাস, নিরাপত্তা সব জায়গায় যখন নিয়ন্ত্রণ থাকে একটি গ্রুপের হাতে, তখন চুরি ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিয়মিত ক্যাবল পাচারের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে সাম্প্রতিক ঘটনায়। গত বুধবার গভীর রাতে ক্যাবল বহনের একটি চালান মেইন গেটে ধরা পড়ার পর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সিকিউরিটি গেট পাস তিন দিনের জন্য স্থগিত করেছে বলে সূত্রে জানা যায়।
কেন্দ্রের ভেতরে কর্মরত একাধিক সূত্র জানায়, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বেশ কিছুদিন ধরেই ক্যাবল, স্ক্র্যাপ ও লোহাজাত দ্রব্য বের করে নেওয়ার একটি চক্র সক্রিয় ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, হাসান-সুমন সিন্ডিকেটের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাতের অন্ধকারে গাড়িতে করে ক্যাবল বের করে আনা হতো।
বুধবারের অভিযানে নিরাপত্তাকর্মীরা একটি গাড়ি ক্যাবলসহ আটক করেন। গেট চেকিংয়ে কর্তব্যরত সদস্যদের কাছে সেটির উৎস এবং পরিবহনের অনুমতি সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে না পারায় সন্দেহ তৈরি হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিযুক্ত পক্ষের একজন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কোলপাওয়ারের নিরাপত্তাকর্মীকে আর্থিক প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ঘটনাটি তাৎক্ষণিক ভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।
কর্মী ও স্থানীয়দের দাবি, এই চক্রের পস্কোর কিউসি ম্যানেজার নাহিদ হাসান এবং সিকিউরিটি অফিসার সুমন বাপ্পির নাম আগে থেকেই আলোচনায় ছিল। এর আগে কয়েকটি ক্যাবল নিখোঁজের ঘটনায়ও তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছিল, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ তা স্বীকার করেনি।
এদিকে ক্যাবল চুরি নিয়ে প্রকল্প এলাকায় ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শ্রমিকরা বলছেন, বারবার বড় পরিমাণ ক্যাবল উধাও হলেও তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হয় না। কিছু কর্মীর দাবি, ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা–কর্মচারীর সহযোগিতা ছাড়া এত বড় মাপের চুরি সম্ভব নয়।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ক্যাবল চুরি নিয়ে আগেও অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়েছে এবং নতুন করে ঘটনার পর নিরাপত্তা প্রটোকল আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কোলপাওয়ার বা পস্কোর পক্ষ থেকে এ ঘটনায় আনুষ্ঠানিক মন্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, বড় প্রকল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা কীভাবে এমন পর্যায়ে পৌঁছালো এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা!?
ক্যাবল চুরির অভিযোগে বারবার আলোচনায় আসা নাহিদ হাসান ও সুমন বাপ্পি কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই দায়িত্বে বহাল থাকেন। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এ দু’জনের প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ভাষায়, “চুরি যদি হয়, সেটা তাদের চ্যানেল দিয়েই হয়।”
অভিযুক্ত কিউসি ম্যানেজার নাহিদ হাসানের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা যায়নি। সিকিউরিটি অফিসার সুমন বাপ্পিও ফোনে সাড়া দেননি।
ক্রমাগত চুরি, দুর্নীতি, অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট ও স্থানীয়দের ক্ষোভ সব মিলিয়ে প্রকল্প এলাকায় অস্থিরতা বাড়ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জমির মালিক ও সাধারণ মানুষ দ্রুত তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলছেন।
তাদের বক্তব্য, সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এই বিশাল প্রকল্পে যদি অভ্যন্তরীণ চুরি-দুর্নীতি বন্ধ না হয়, তাহলে প্রকল্পের নিরাপত্তা, সময়সীমা, বাজেট সবই ঝুঁকিতে পড়বে।