কক্সবাজারে এডিসি স্বামীর দাপটে অফিসে অনুপস্থিত উপ-তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা
সরকারি শিশু পরিবারে অনিয়ম-দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ
হাফিজুর রহমান খান, স্টাফ রিপোর্টার (কক্সবাজার)।।
এতিম ও দুস্থ শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত সরকারি শিশু পরিবার। কিন্তু কক্সবাজার সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীন খরুলিয়ায় অবস্থিত সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) যেন এখন ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশিতে পরিচালিত হচ্ছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এই শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন মাসের অধিকাংশ সময়ই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দীর্ঘ চার মাসের অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি মাসে গড়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ দিন অফিসে আসেন এবং তাও সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৬০ মিনিট অবস্থান করেন।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর স্বামী কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নিজাম উদ্দীন আহমেদের প্রভাবেই এমন দায়িত্বহীন আচরণ করছেন তানজিনা আফরিন। অনুসন্ধানকালে গত সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত অন্তত ২০ বার সরেজমিনে সরকারি শিশু পরিবারে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
হাজিরা খাতা ও স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি সপ্তাহে একদিনও নিয়মিত অফিস করেন না। মাঝেমধ্যে বিকেল ৫টার পর ব্যক্তিগত গাড়িতে এসে শুধু সই-স্বাক্ষরের কাজ সেরে দ্রুত চলে যান। প্রতিবেদকের একাধিকবার সাক্ষাৎ চেষ্টার সময় তিনি ‘শিশুদের জন্য বাজার করতে বের হয়েছেন’—এমন অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যান। পরে জানা যায়, দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন—তাঁর খোঁজ করলে যেন ‘বাজারের কাজে বাইরে আছেন’ বলা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী জানান, যোগদানের পর থেকেই তানজিনা আফরিনের অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে। কেউ প্রশ্ন তুললে তিনি উদ্ধতভাবে বলেন, “মানুষের ৩০-৩৫ বছর চাকরি করে যে অভিজ্ঞতা হয়, আমার তার চেয়েও বেশি আছে। তাই নিয়মিত অফিস করার প্রয়োজন নেই।”
অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি সমাজসেবা কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানলেও এডিসি নিজাম উদ্দীনের প্রভাব ও সম্ভাব্য রোষানলের ভয়ে কেউ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছেন না। একবার তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর এডিসি ক্ষোভ ঝাড়েন বলেও জানা গেছে।
সরকারি শিশু পরিবারে ১০০ জন বালিকার বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে সেখানে রয়েছে ৯৫ জন। প্রতিটি শিশুর জন্য মাসে খাবার বাবদ ৪ হাজার টাকা এবং শিক্ষা উপকরণের জন্য ১ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও থেকেও নিয়মিত বড় অংকের অনুদান আসে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, এসব অর্থের সঠিক হিসাব রাখা হয় না। নিয়ম অনুযায়ী ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী এতিম ও অতি অসচ্ছল বালিকাদের ভর্তির কথা থাকলেও বাস্তবে সচ্ছল পরিবার ও বাবা-মা জীবিত এমন শিশুরাও এখানে ভর্তি রয়েছে। সূত্র জানায়, এনজিওর অনুদানের অর্থ দিয়ে অনেক ব্যয় চালানো হলেও সরকারি বরাদ্দের বড় একটি অংশ তছরুপ হচ্ছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে উপ-তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন দাবি করেন, তিনি অধিকাংশ দাপ্তরিক কাজ ‘বাসায় বসে’ সম্পন্ন করেন এবং হোস্টেলের বাজার ও বিভিন্ন মিটিংয়ের কারণে অফিসে নিয়মিত থাকা সম্ভব হয় না।
তবে সরেজমিনে তাঁর এই দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনি কেবল নামমাত্র সময়ের জন্য বিকেল ৫টার পর অফিসে আসেন। এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার সরাসরি ও মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি তা এড়িয়ে যান। এমনকি পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী তাঁর আমন্ত্রণে দপ্তরে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “সরকারি শিশু পরিবারের হোস্টেলগুলোতে সপ্তাহের সাত দিনই কর্মঘণ্টা নির্ধারিত। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। এর ব্যত্যয় ঘটানো সরকারি বিধি লঙ্ঘনের শামিল।”
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক মো. সফি উদ্দিন বলেন, “একজন উপ-তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল। কেউ যদি মাসে মাত্র ৪-৫ দিন অফিস করেন, সেটি গুরুতর অপরাধ। অভিযোগগুলো যাচাই করে সরকারি বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”