
রাউজানে সন্ত্রাসী তাণ্ডব মামলায় ১৩ নম্বর আসামি আল সাদিক গ্রেফতার, চট্টগ্রাম কারাগারে দীর্ঘদিন পর মামলায় বড় অগ্রগতি
স্টাফ রিপোর্টার
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় সংঘটিত বহুল আলোচিত সন্ত্রাসী হামলা, চাঁদাবাজি, লুটপাট ও অপহরণচেষ্টার ঘটনায় দায়ের করা দ্রুত বিচার মামলায় অবশেষে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা দিয়েছে। মামলার ১৩ নম্বর আসামি মুহাম্মদ আল সাদিক (২৮) গতকাল গভীর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর তার গ্রেফতারকে এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, বাদী সহিদুল ইসলাম রাউজান থানাধীন কাগতিয়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি একজন শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে উল্লেখ করে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, জবরদখল, মারধর, লুটপাট এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল এবং প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় রাখত।
এজাহারে উল্লেখ রয়েছে, ২০১৯ সালের ১০ মে বিকাল আনুমানিক ৫টার দিকে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪০ জনের অধিক আসামি দেশীয় অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র, শটগান, রামদা, কিরিচ, ধারালো দা, লোহার রড, হাতুড়ি ও হকি স্টিকসহ বাদীর বসতবাড়িতে হামলা চালায়। তারা প্রথমে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করতে ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক ছড়ায় এবং পরে জোরপূর্বক বাড়িতে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাদীকে ঘর থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে উঠানে ফেলে নির্মমভাবে মারধর করে গুরুতর আহত করে। এসময় ৪, ৭ ও ৮ নম্বর আসামিসহ অন্যরা তাকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। পরবর্তীতে ৯ থেকে ১২ নম্বর আসামিরা হকি স্টিক ও গাছের বাটাম দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে গুরুতর জখম করে।
একইসঙ্গে ৫, ১৩ ও ১৪ নম্বর আসামিসহ কয়েকজন বাদীর ঘরে প্রবেশ করে আলমারির ড্রয়ার ভেঙে নগদ প্রায় ২ লক্ষ টাকা লুট করে নেয়। ১৫ থেকে ২০ নম্বর আসামিরা লোহার সিন্দুক ভেঙে বাদীর স্ত্রীর প্রায় ৫ ভরি স্বর্ণালংকার যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫ লক্ষ টাকা তা নিয়ে যায়। ২১ থেকে ২৩ নম্বর আসামিরা দুইটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন লুট করে নেয়। ২৪ থেকে ৪০ নম্বর আসামিরা ঘরের টেলিভিশন, ফ্রিজ, আলমারি, শোকেসসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভেঙে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ঘটনার পূর্বে আসামিরা বাদীর কাছে ১০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং তা প্রদান না করলে তাকে বাড়িতে থাকতে দেবে না বলে হুমকি দেয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়। হামলার পর আসামিরা বাদীকে অপহরণের উদ্দেশ্যে হাত পা বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় এবং প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করে।
মামলায় মোট ৪০ জনের অধিক আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন এ.বি.এম. ফজলে করিম চৌধুরী, জমির উদ্দীন পারভেজ, আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, লায়ন সাহাবুদ্দিন আরিফ, মুহাম্মদ আবু তৈয়ব, আবদুল্লাহ আল করিম, আবদুল্লাহ আল আমিন, আবদুল্লাহ আল হেলাল, মুহাম্মদ আকতার হোসেন, মোহাম্মদ জাবেদ, মুহাম্মদ ফোরকান, মৌলানা জামাল উদ্দিন, মুহাম্মদ আল সাদিক, মুহাম্মদ নজরুল, মুহাম্মদ ফাহিম, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল ফারুক, মুহাম্মদ আবদুস সালাম, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, মুহাম্মদ লতিফ, মুহাম্মদ আলা উদ্দিন, মুহাম্মদ পিয়ার হোসেন, মুহাম্মদ দৌলত, মুহাম্মদ জিসান, মোঃ সাইফুল ইসলাম লিটন, মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মেম্বার, মুহাম্মদ দুলাল মেম্বার, মুহাম্মদ মজুম খান, মুহাম্মদ আবদুল আজিজ, মুহাম্মদ ইব্রাহিম, রুনা আক্তার, মুহাম্মদ দেলোয়ার, মুহাম্মদ মনছুর, মোহাম্মদ বেদার, মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মোহাম্মদ আবদুর রহিম, মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ শহিদুল, মোহাম্মদ ইউছুফ, মোহাম্মদ মিয়া, আল আমিন সাব্বিরসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন।
এই মামলার ১৩ নম্বর আসামি মুহাম্মদ আল সাদিককে অভিযোগে সরাসরি অংশগ্রহণকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে হামলা, মারধর ও লুটপাটে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর তার গ্রেফতার এই মামলার তদন্তে নতুন গতি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে একই সময়ে চট্টগ্রাম নগরীতে আলোচিত আরেক ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ সরকারি হাজী মুহাম্মদ মুহসিন কলেজকেন্দ্রিক বিতর্কিত ব্যক্তি ও ছাত্রলীগের সাবেক ক্যাডার সাদিক আব্দুল্লাহকে গ্রেফতার করেছে। নগরীর অক্সিজেন এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে একটি সিআর মামলার ওয়ারেন্ট ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা এই ব্যক্তিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সাদিক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে সহিংসতা, চাঁদাবাজি এবং ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তিনি একসময় মুহসিন কলেজ ছাত্রলীগের প্রভাবশালী ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গ্রেফতারের পর তাকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাউজানের মামলার ১৩ নম্বর আসামি আল সাদিক এবং নগরীর আলোচিত সাদিক আব্দুল্লাহ গ্রেফতারের ঘটনায় চট্টগ্রাম জুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে পলাতক আসামিদের গ্রেফতার হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, রাউজানের মামলার অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সবশেষে বলা যায়, দীর্ঘদিনের আলোচিত এই মামলায় ১৩ নম্বর আসামির গ্রেফতার একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।