
আবদুল কাদের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
আজ থেকে প্রায় ৬৬০ বছর পূর্বে বাংলার রাজধানী সোনার গায়ের শাসনুর“তা সুলতান ফখর উদ্দীন মোবারক শাহের (১৩৪৫খৃঃ) সেনাপতি কদল খাঁন গাজী চট্টগ্রাম জয় করেন। মধ্যযুুগীয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি মোহাম্মদ খানের ‘মুক্তল হোসেন’ কাব্যের ভূমিকা অনুযায়ী ঠিক সে সময়ে দুজন আরবী ধর্ম প্রচারক দরবেশ হাজী খলিল পীর(রঃ) ও আওলাদে রাসূল,হযরত ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতেয়ার মাহী সওয়ার(রাঃ) সুদুর আরব দেশ থেকে মধ্য এশিয়ার বলখ হয়ে সমুদ্র পথে মাছের পিঠে আরোহন করে চট্টগ্রাম আগমণ করেন। কদল খান গাজী ঐ দুজন দরবেশকে আতিথেয়তা করেন ও স্থায়ীভাবে চট্টগ্রাম বসবাস করে ধর্ম প্রচার করার সুব্যবস্থা করেছেন। পরবর্তীতে কদল খাঁন গাজীর সহিত উনাদের গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে। কবির বর্ণনা অনুযায়ী কদল খাঁন গাজীসহ ঐ তিন জন দরবেশই চট্টগ্রামের বার আওলিয়ার অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। যাদের মধ্যে আওলাদে রাসূল,হযরত ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতেয়ার মাহী সওয়ার(রাঃ) এর বংশধারা পিতার দিক থেকে হযরত আবু বক্কর ছিদ্দিক রাদ্দিয়াল্লাহু আনহু ও মাতার দিক থেকে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লম এর সাথে মিলে যায়। এ হযরত ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতেয়ার মাহী সওয়ার (রাঃ) এর অধস্থন পুরুষদের মধ্যে বাংলার নবাব শায়েখ খাঁনের চট্টগ্রাম অঞ্চলীয় প্রশাসক ছুটি খাঁন, গাভূত খাঁন, মজলিশে আলা রা¯ি— খাঁন, বর্তমান মিরসরাই থানার আবু তোরাব অঞ্চলের স্মৃতি বাহক চৌধুরী মোহাম্মদ আবু তোরাব, চট্টগ্রাম শহরের জামাল খাঁন রোডের চৌধুরী জামাল খাঁন ও হালিশহরের সুলতানুল আউলিয়া সৈয়্যদ হাফেজ মুনির উদ্দীন (রাঃ) উলেখযোগ্য। হযরত ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতেয়ার মাহী সওয়ার(রাঃ) সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক জনাব মাহবুবুল আলম সাহেব বার আউলিয়ার তালিকা নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেন।
(১) হযরত শাহ বদর (রঃ)
(২) হযরত ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতেয়ার মাহী সওয়ার (রাঃ)
(৩) হযরত হাজী খলিল (রঃ)
(৪) হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ)
(৫) হযরত শাহ কাতাল (রঃ)
(৬) হযরত শাহ বাদল (রঃ)
(৭) হযরত শাহ চান্দ আউলিয়া (রঃ)
(৮) হযরত শাহ জাজ (রঃ)
(৯) হযরত শাহ মারফুদ্দীন (রঃ)
(১০) হযরত শাহ ওমর (রঃ)
(১১) হযরত শাহ পীর (রঃ)
(১২) অজ্ঞাত।
উল্লেখিত আওলাদে রাসূল, হযরত ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতেয়ার মাহী সওয়ার (রাঃ) হলেন কাগতিয়া আলিয়া গাউছুল আজম রাদ্দিয়াল্লাহু আনহু’র পূর্ব পুরুষ। তিনি তার অনেক সহচর নিয়ে মাছের পিঠে আরোহন করে প্রথমত সন্দীপ আগমণ করেন। সন্দীপের অধুনা বিলুপ্ত রোহিনী নামক স্থানে তাঁদের আবাস ছিল। সেখান থেকে অন্যান্য দরবেশকে পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন। সেখানে তিনি কিছু দিন অবস্থান করেন ও পবিত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সন্দীপের তৎকালীন জমিদার ও প্রশাসক দিলাল রাজা ও আবু তোরাব শহীদ তাঁর অধস্তন বংশধর। পরবর্তীতে তিনি ও হাজী খলিল (রঃ) চট্টগ্রামে আগমণ করেন।
আরব দেশাগত এই বিখ্যাত দরবেশের ব্যাপারে ঢাকার আজিমপুরের বিশিষ্ট সাধক সুফী সৈয়্যদ দায়েম উলাহ ও প্রখ্যাত লেখক এ. বি. এম. ছিদ্দিক চৌধুরী ও ঢাকার তৎকালীন ঐতিহাসিক হাকিম হাবীবুর রহমানের বর্ণনানুযায়ী আওলাদে রাসূল,হযরত ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতেয়ার মাহী সওয়ার(রাঃ) হযরত বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ) এর বংশধর। সুফি দায়েম উলাহ (রঃ) নিজেকে হযরত ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতেয়ার মাহী সওয়ার(রাঃ) এর বংশধর হিসাবে বংশধারা বর্ণনা দিয়েছেন।
উপরোক্ত সূফী ও লেখকদ্বয়ের প্রদত্ত তথ্যে হযরত ছৈয়্যদ বখতেয়ার মাহী সওয়ার(রাঃ) এর চট্টগ্রাম আগমণ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনায় আরব দেশ হতে হযরত ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতেয়ার মাহী সওয়ার(রাঃ) মাছের পিঠে আরোহন করে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গ মালা পাড়ি দিয়ে কর্ণফুলী নদীর নির্দিষ্ট একটি জায়গায় পৌছে আকাশ হতে একটি গায়েবী আওয়াজ শুনতে পান ‘উনজুর হা-উলায়ে এয়া বখতেয়ার’ অর্থাৎ হে বখতেয়ার! এই দিকে নজর করে দেখ। এই আওয়াজটি তিন বার শুনার পর তিনি চোখ খুলে আসমানের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ‘উনজুর হা-উলায়ে? যেহেতু তিনি মাছের পিঠে মোরাকাবারত ছিলেন। একথা বলার পর পর তিনি ঐ জায়গাটিতে মাছের পিঠ থেকে নেমে পড়েন এবং তিনবার উচ্চারণ করেন ‘আলহামদুলিলাহ’ হা-উলায়ে। তিনি যে জায়গাতে অবতরণ করেন, হা-উলায়ে শব্দ থেকে ঐ জায়গাটির নাম হাওলা নামে খ্যাত হয়। তারা যে মাছটির পিঠে সওয়ার হয়ে আগমন করেছিলেন মাছটি একটি রুই জাতীয় মাছ ছিল। অবতরনের পর পর উনি মাছটি কর্ণফুলী নদীর পার্শ্বস্থ একটি শাখা নদীতে গিয়ে বৎসরে একবার ডিম দেয়ার জন্য নিদের্শ দেন। পরবর্তিতে কর্ণফুলী নদীর ঐ শাখা নদীটি হা- উলায়ে শব্দ থেকে বা হাওলা, আর হাওলা থেকে হালদা নদী নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্ণিত এই ‘হাওলা’ এলাকাটি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার চরণদ্বীপ ইউনিয়নের একটি গ্রাম, যার নাম বর্তমানে ছৈয়দপুর এবং কর্ণফুলী নদীর ঐ শাখা নদীটি বর্তমানে হালদা নদী।
যে নদীটি কাগতিয়া আলীয়া গাউছুল আজম দরবার শরীফের পশ্চিমে প্রবাহিত একটি নদী। ঐ নদীতে এখনো বৎসরে একবার নির্দিষ্ট সময়ে ঐ মাছের বংশরা ডিম ছেড়ে থাকে। এভাবে একটি নির্দিষ্ট নদী ও জায়গাতে মাছের পোনা ছাড়ার ব্যাপারটি সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে বিরল। বর্তমানে বোয়ালখালী থানার চরণদ্বীপ এলাকাটি তাদের পবিত্র চরণ রাখা ও খরনদ্বীপ এলাকাটি তাদের পবিত্র খরন (জুতা) রাখার ফলে নাম করণ হয়ে থাকে। এই বখতেয়ার মাহী সাওয়ারের বংশের মধ্যে একজন হলেন সৈয়দ আওলিয়া (রহঃ) আর একজন হলেন সৈয়দ লাল মোহাম্মদ কাতেব(রাঃ)। উলেখ্য যে, চট্টগ্রাম আরাকানী আক্রমণ ও বহিঃ শত্র“ ফিরিঙ্গী বেনীয়াদের কালো থাবায় যখন এতদঞ্চলের মুসলমানগণ দিশেহারা, সাদা চামড়ার ফিরিঙ্গি বেনিয়ারা যখন এ দেশের মুসলমানদের জোর পূর্বক ধর্মান্তরিত করার কাজে লিপ্ত, ঠিক সেই সময় ছৈয়্যদ মুহাম্মদ বখতেয়ার মাহি ছওয়ার(রাঃ) এর বংশধর ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্য রাউজান থানার অর্ন্তগত কাগতিয়া মাইজপাড়া ও আধাঁর মানিক অঞ্চলে আগমণ করেন। আধাঁর মানিক অঞ্চলে সৈয়দ আউলিয়ার বংশধর পূর্ব পুরু